শনিবার ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

>>
পর্ব-১

মুক্তিযুদ্ধে কালীগঞ্জের শহীদ

ড. মোঃ এনায়েত হোসেন   |   মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট

মুক্তিযুদ্ধে কালীগঞ্জের শহীদ

শহীদ শব্দটি মুল আরবী শাহীদ শব্দের সমর্থক শব্দ। “ শাহীদ ” শব্দটি একবচন। “ শুহাদা ” বহুবাচন। যার অর্থ স্বাক্ষী,আল্লাহর পথে প্রাণ কোরবানকারী। প্রকৃতপক্ষে শাহীদ শব্দের প্রয়োগ সেই ব্যক্তি সম্পর্কে হয়,যে আল্লাহর পথে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করে। পরবর্তীতে শাহীদ শব্দের অর্থের ব্যাপকতার সৃষ্টি হয় এবং সেই সব ব্যক্তি সম্পর্কেও এর ব্যবহার হতে থাকে, যারা কলেরা ইত্যাদি রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে কিংবা গৃহ প্রভৃতির নীচে চাপা পড়ে মারা যায়।

আল্লাহ কোরআনে বলেন, “তোমাদেরকে বিপদ-মুসিবত দিয়ে আল্লাহ জেনে নিতে চান তোমাদের মধ্যে কারা প্রকৃত ঈমানদার এবং এজন্য তিনি তোমাদের কিছু লোককে শাহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান”। সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৪০; “শাহীদদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে উত্তম প্রতিফল এবং তাদের জন্য রয়েছে আলো বা নূর”। সূরা আল হাদীদ, আয়াত-১৯। হাদীস গ্রন্থ সমূহে শাহীদ পরিভাষাটি বিশেষভাবে সেই ব্যক্তির জন্য প্রযুক্ত হয়, যে অবিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধ করে প্রাণ দান করে এবং এভাবে স্বীয় ঈমানের সত্যতা প্রমাণ করে।
এই প্রবন্ধে শহীদ বলতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধে নিহতদেরকে বুঝানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার যে সব মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ মানুষ পাকিস্তানী আর্মির সাথে সম্মুখ সমরে বা পাক বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন, এই প্রবন্ধে তাদের মধ্যে নির্বাচিত কয়েকজন শহীদের সংক্ষিপ্ত জীবনকাল আলোচনা করা হয়েছে।
১. শহীদ ফজলুর রহমান ভূইয়া(মুক্তার)
শহীদ ফজলুর রহমান ভূইয়া (মুক্তার) গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তুমিলিয়া ইউনিয়নের টিউরী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুস সালাম ভূইয়া। শহীদ মুক্তার ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে তিনি ছুটিতে গ্রামে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অস্ত্র সংগ্রহ করতে ভারত যান। ভারত থেকে অস্ত্র নিয়ে দেশে ফিরে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মধ্য নভেম্বরে সোমবাজার রেজিষ্ট্রি অফিস খালের মুখ এলাকায় পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ শুরু হলে শহীদ মুক্তার এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। পাকবাহিনীর অবস্থান ছিল সোমবাজর খালের উত্তর পাশে। আর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছিল খালের দক্ষিণ পাশে। এই যুদ্ধে আনোয়ার হোসেন, রাথুরার সিরাজ, আলী হোসেন তালুকদার,ঢাকার ফেরদাউস খান(মেজর) প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধা অংশ গ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপত্তা জনিত কারণে গোপন পাসওয়ার্ড বা সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করেন। ভিন্ন ভিন্ন দিনে ভিন্ন ভিন্ন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হতো। এই দিনের পাসওয়ার্ড ছিল চাঁদ-তাঁরা। শহীদ মুক্তার প্রাকৃতিক প্রয়োজনে তাঁর অবস্থান থেকে বাইরে যান। ফিরে আসার সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন মুক্তিযোদ্ধা সেন্ট্রি তাঁকে পাসওয়ার্ড জিজ্ঞাসা করলে তিনি পাসওয়ার্ড ভুলে যাবার কারণে তা বলতে না পারায় এই মুক্তিযোদ্ধা তাৎক্ষনিকভাবে তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন। মুক্তার শহীদ হবার পর মেজর ফেরদাউস খান যুদ্ধের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মেজর ফেরদাউস খান স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিরোধ থাকার কথা উল্লেখ করেন। স্বপক্ষীয় যোদ্ধার গুলিতে মুক্তার শহীদ হওয়ায় এই হত্যাকান্ডকে ঘিরে পরবর্তীতে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যুদ্ধের কমান্ডারকে তাঁর সহযোদ্ধার চিনতে না পারার কথা নয়। শহীদ মুক্তারকে তাঁর গ্রামের বাড়ি টিউরী দাফন করা হয়। শহীদ মুক্তারের অগ্রজ সহোদর নাসিরউদ্দিন ভূইয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শহীদ মুক্তার ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চে ছুটিতে আসলে তাঁকে বিয়ে করানো হয়। তবে সে সময়ের রীতি অনুযায়ী বউ উঠিয়ে আনা হয়নি। নতুন বউ তার পিতার বাড়িতে ছিলেন। তাদের দাম্পত্য জীবন শুরুর আগেই মুক্তার শহীদ হন। শহীদ মুক্তারকে স্মরণীয় করে রাখতে তাঁর গ্রামের নাম মুক্তারনগর রাখার প্রস্তাব করা হলেও গ্রামটি মুক্তারনগর নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেনি। [সাক্ষাৎকার ঃ মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অবঃ) মোঃ ফেরদাউস খান, তারিখঃ ২৪/০১/২০০৬; মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মিয়া; তারিখঃ ২৬/১২/২০০৫খ্রি. প্রতিবেশী- আলতাফ হোসেন; তারিখ ঃ ২০/০৫/২০০৪, নাসিরউদ্দিন ভূইয়া(শহীদ মুক্তারের অগ্রজ সহোদর)]। সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থানঃ দক্ষিণ সোম,কালীগঞ্জ,গাজীপুর।
২. শহীদ আবু হানিফ আকন্দ
শহীদ আবু হানিফ আকন্দ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নের দেওতলা গ্রামে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হেকিম আকন্দ। মায়ের নাম মোছাম্মৎ মরিয়ম বেগম। শহীদ আবু হানিফ জাঙ্গালীয়া জুনিয়র বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণি পাশ করে পুবাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুবাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ক্লাসে তার রোল নম্বর ছিল ০৩। জাঙ্গালীয়া গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস মোল্লা তার সহপাঠী ছিলেন। শহীদ হানিফ মেট্রিক পাশ করে নরসিংদী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তিনি কলেজে লেখাপড়ার সাথে সাথে চাকরির পরীক্ষা দিতে থাকেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অম্পিনগর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে তিনি গ্রুপ কমান্ডার মোজাম্মেল হক মন্টুর নেতৃত্বে পলাশ ফিরে আসেন। পলাশ মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পাক আর্মি হামলা করলে আবু হানিফ তাদের হাতে গ্রেফতার হন। পাক আর্মি তাঁকে এখানে হত্যা করে। ঘটনাস্থলে তাঁর মস্তকবিহীন দেহ পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন তাঁর মৃত দেহ দাফন করে। ফুলদি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোফাজ্জল হোসেন শহীদ আবু হানিফের সহযোদ্ধা ছিলেন। শহীদ আবু হানিফ মুক্তিযুদ্ধে যাবার পর তাঁর বাড়িতে ব্যাংকের চাকরির নিয়োগপত্র আসে।
সাক্ষাৎকারঃ মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোফাজ্জল হোসেন, গ্রামঃ ফুলদি, কালীগঞ্জ,গাজীপুর, তারিখঃ ২৩/১২/২০০৫খ্রি.; মুজিবুর রহমান, শহীদ আবু হানিফের অনুজ সহোদর, গ্রামঃ দেওতলা,কালীগঞ্জ,গাজীপুর। তারিখঃ ২৮/১২/২০২৫ খ্রি.

৩. শহীদ জয়নাল আবেদীন খান
শহীদ জয়নাল আবেদীন খান গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নের কাউলিতা গ্রামে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোঃ আবু তাহের খান। মায়ের নাম শরফুননেছা। শহীদ জয়নাল আবেদীন ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে কাপাসিয়া উপজেলার রানীগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পরীক্ষা পাশ করেন। তিনি কাপাসিয়া কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। তিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধীনে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ডি কোম্পানির সদস্য ছিলেন। সে সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মেট্রিক পাশ করার পর ১৮-২২ বছরের যুবকদের জন্য বাধ্যতামূলক মিলিটারি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ২৫ মার্চ তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ রত ছিলেন। সেনাকর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণ স্থগিত রেখে ৮ এপ্রিল প্রশিক্ষণরত জোয়ানদেরকে রিলিজ দেয়। কোন আউট পাশ ছাড়াই তাঁদেরকে মৌখিকভাবে ছুটি দেয়া হয়। ছুটি পেয়ে তিনি বাড়ি আসার প্রস্তুতি নেন। ৯ এপ্রিল সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে অন্যান্য জোয়ানদের সাথে তিনি রাজবাড়ি জয়দেবপুর একটি আর্মি ক্যাম্পে আসেন। এই দলে ৬৬ জন জোয়ান ছিল। তাঁদেরকে চারিদিক থেকে ৬/৭ ফুট উঁচু দেয়াল ঘেরা একটি ক্যাম্পে রেখে বাইরে থেকে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এই গ্রেনেড হামলায় জয়নাল আবেদীনসহ ৫৬জন জোয়ান শহীদ হন। সৌভাগ্য ক্রমে ১০জন জোয়ান আহত হয়েও কোনভাবে প্রাণে রক্ষা পান। বেচেঁ যাওয়া এই জোয়ানদের মধ্যে আজমতপুর গ্রামের জনাব বেলায়েত হোসেন খান মাস্টার ছিলেন।
সাক্ষাতকারঃমমতাজউদ্দিন,শহীদ জয়নাল আবেদীনের অগ্রজ সহোদর,কাউলিতা,কালীগঞ্জ,গাজীপুর,তারিখ ঃ ২৮/১২/২০০৫ খ্রি.; মুক্তিযোদ্ধা বেলায়েত হোসেন খান মাস্টার, আজমতপুর,কালীগঞ্জ,গাজীপুর,তারিখ ঃ ৩০/১২/২০০৫ খ্রি.।
৪. শহীদ মোঃ মোজাফফর হোসেন
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোজাফফর হোসেন গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরশাদী ইউনিয়নের ইশ্বরপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আহাদ বক্স ভূইয়া। মায়ের নাম মফিজা খাতুন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শহীদ মোজাফফর হোসেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জামালপুর-বাশাইর যুদ্ধে অংশ নিতে আসা পাকবাহিনীর একটি দল পথ ভুলে ইশ্বরপুর গ্রামের মধ্য দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শহীদ মোজাফফর দূরে দাড়িয়ে পাকবাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে একজন পাক আর্মি নিহত হয়। অতপর পাল্টা গুলি চালিয়ে পাকবাহিনী মোজাফফরকে হত্যা করে। তাঁকে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। শহীদ হবার সময় তার বয়স ছিল আনুমানিক ২০/২২ বছর। এ সময় স্মৃতি নামের তাঁর একটি কন্যা ছিল। শহীদ মোজাফফরের স্ত্রীর অন্যত্র বিয়ে হয়।
সাক্ষাৎকারঃ মফিজা খাতুন(শহীদ মোজাফফর হোসেনের মা), কালীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়,কালীগঞ্জ,গাজীপুর, তারিখ ঃ ১৬/১২/২০০৫ খ্রি.।

৫. শহীদ সার্জেন্ট সামছুল করিম খান সিরাজ
শহীদ সার্জেন্ট সামছুল করিম খান সিরাজ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের বেরুয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ডাক্তার ফজলুল করিম খান এবং মাতার নাম খাতেমুন্নেছা খানম। শহীদ সিরাজ ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে পিতার কর্মস্থল বার্মায় জন্ম গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর পিতা ডাক্তার এফ. করিম খান বার্মা রেলওয়ে হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন (১৯৩৯-১৯৪৫) ১৯৪৫ খিস্টাব্দে শহীদ সিরাজ কালীগঞ্জে গ্রামের বাড়ি ফিরে আসেন এবং কালীগঞ্জ আর.আর. এন. উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ১৯৪৮খ্রিস্টাব্দে মেট্রিক পাশ করে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে শহীদ সিরাজ পরোক্ষভাবে এ আন্দোলনে যোগদান করেন। সার্জেন্ট সিরাজ যখন পাবনার ইশ্বরদীতে কর্মরত ছিলেন তখন দেশে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। দেশকে শত্রু মুক্ত করতে তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পরিবারের খোঁজ নিতে তিনি ইশ্বরদী থেকে ঢাকা আসার পথে মানিকগঞ্জের স্থানীয় জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা আটক হন। তারা তাঁকে পাকিস্তানী সৈন্য বলে সন্দেহ করে। শহীদ সিরাজের ভগ্নিপতি মানিকগঞ্জের বাচামারার বাসিন্দা নাসিরউদ্দিনের পরিচয় পেয়ে জনগণ তাঁকে ছেড়ে দেয়। তিনি ভগ্নিপতির বাড়িতে কিছুদিন অবস্থান করে স্থানীয় যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করতে তিনি ১৩ এপ্রিল ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা সেনানীবাসে আসেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি পাকবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। ইতিমধ্যে তাঁর পরিবার ছোটভাই ছগির খানের সাথে গ্রামের বাড়ি চলে আসে। পাক বাহিনী শহীদ সিরাজকে নির্যাতন করে, ইলেকট্রিক শক দিয়ে,বেয়োনেট চার্জ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। সহোদর অনুজ ছগির খান বড়ভাইয়ের খোঁজ নিতে ঢাকা সেনানীবাসে এলে তিনিও গ্রেফতার হয়ে নিখোঁজ হন। খান মোহাম্মদ ছগির আর ফিরে আসেনি। [সাক্ষাৎকারঃ আলহাজ খান মোহাম্মদ সফর, শহীদের অনুজ সহোদর তারিখঃ ২০/১২/২০০৫ খ্রি.] বেরুয়া,কালীগঞ্জ,গাজীপুর।
৬. শহীদ হারিছুল হক
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হারিছুল হক গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মুক্তারপুর ইউনিয়নের ডেমরা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ইদ্রিস আলী। মায়ের নাম কমলা খাতুন। শহীদ হারিছুল হক ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখা পড়া করেন। তিনি পলাশ ফৌজি জুট মিলে শ্রমিক পদে চাকরি করতেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শহীদ হারিছুল হক ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা হেজামারা লেবুছড়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পথে তিনি কুমিল্লা জেলার নবীনগরে মেঘনা মোড়ে পাক আর্মির হাতে ধরা পড়েন। পাক আর্মি তাঁকে নৌকা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর মৃত দেহ পাওয়া যায়নি।
সাক্ষাৎকার ঃ মুক্তিযোদ্ধা গিয়াসউদ্দিন,কালীগঞ্জ,গাজীপুর,তারিখঃ ১৬/১২/২০০৫ খ্রি.; উপজেলা নির্বাহী অফিসার,কালীগঞ্জ,গাজীপুর কার্যালয় এর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত নথি।

৭. শহীদ মাহবুবুর রহমান ছাদেক
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান ছাদেক গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মুক্তারপুর ইউনিয়নের ডেমরা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মিজানুর রহমান। মায়ের নাম হাফেজা খাতুন। শহীদ ছাদেক এ সময় ৯ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শহীদ ছাদেক ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা হেজামারা লেবুছড়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পথে তিনি কুমিল্লা জেলার নবীনগরে মেঘনা মোড়ে পাক আর্মির হাতে ধরা পড়েন। পাক আর্মি তাঁকে নৌকা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়নি।
সাক্ষাৎকার ঃ মুক্তিযোদ্ধা গিয়াসউদ্দিন,কালীগঞ্জ,গাজীপুর,তারিখঃ ১৬/১২/২০০৫ খ্রি.; উপজেলা নির্বাহী অফিসার,কালীগঞ্জ,গাজীপুর কার্যালয় এর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত নথি।
(চলবে)।

লেখক ঃ ড.মোঃ এনায়েত হোসেন
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার ও গণমাধ্যম কর্মী।

Facebook Comments Box

Posted ২:৩০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫

dainikbanglarnabokantha.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

রূপা
(1912 বার পঠিত)
ছোটগল্প (দেনা)
(1303 বার পঠিত)
দূর দেশ
(1225 বার পঠিত)
কচু শাক চুরি
(1205 বার পঠিত)
কৃষ্ণ কলি
(1124 বার পঠিত)

সম্পাদক

রুমাজ্জল হোসেন রুবেল

বাণিজ্যিক কার্যালয় :

১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

design and development by : webnewsdesign.com

nilüfer escort coin master free spins